বারাসাতের নীল আকাশ - দ্বাদশ পর্ব : বৃষ্টির দিনে পুরনো চায়ের দোকানে অর্ণব ও তিতলি
বারাসাতের বৃষ্টিভেজা দুপুরে এক পুরনো চায়ের দোকানে আশ্রয় নেয় অর্ণব ও তিতলি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ আর তিতলির আঁকা ছবির মাঝে ফুটে ওঠে এক গভীর অনুভূতির গল্প।
Bengali Serial Fiction ✦ দ্বাদশ পর্ব
বারাসাতের নীল আকাশ
"ভবিষ্যতের ঠিকানা"
বর্ষার বারাসাত — থামে না এই শহর
বর্ষা পুরোদমে এলে বারাসাত একটু অন্যরকম হয়।
রাস্তায় জল জমে। কিছু গলি হাঁটু পর্যন্ত ডোবে। স্কুলের মাঠে পুকুর হয়। পুরনো বাড়ির ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ে।
কিন্তু মানুষ থামে না।
বারাসাতের মানুষ বৃষ্টিতেও হাঁটে। ভিজতে ভিজতে বাজার করে। ছাতা মাথায় দিয়ে অফিস যায়। চায়ের দোকানে বসে বৃষ্টি দেখে।
এই শহর থামতে জানে না।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি। একটা শনিবার।
অর্ণব আর তিতলি বেরিয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল শব্দলোকে যাবে। তারপর হয়তো একটু হাঁটবে।
কিন্তু মাঝপথে বৃষ্টি নামল। হঠাৎ নয় — আস্তে আস্তে। প্রথমে ফোঁটা ফোঁটা। তারপর একটু বেশি। তারপর মুহূর্তে প্রবল।
ছাতা ছিল। তিতলির কাছে। কিন্তু একটাই। দুজন একটা ছাতার নিচে। কিন্তু ছাতাটা ছোট।
তিতলি ছাতা ধরে আছে। অর্ণব একটু বাইরে। একদিক ভিজছে।
"কাছে আসো। ভিজছ।"
"ঠিক আছে।"
"ঠিক নেই। কাছে আসো।"
অর্ণব কাছে এল। ছাতার নিচে। তিতলির পাশে। খুব কাছে।
"কোথায় যাবে?" তিতলি বলল। বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে।
"কোনো দোকানে ঢুকি।"
সামনে তাকাল। চাঁপাতলার মোড়ে একটা পুরনো চায়ের দোকান। সরু। কাঠের বেঞ্চ। টিনের চাল।
পুরনো চায়ের দোকান — বৃষ্টিতে আটকে পড়াদোকানদার একজন বয়স্ক মহিলা। বয়স ষাটের কাছে। চুল পাকা। মুখে বলিরেখা। কিন্তু চোখে একটা উষ্ণতা।
"বসো বাবা।" বললেন। বসল দুজন। কাঠের বেঞ্চে। পাশাপাশি।
ছাদে বৃষ্টির শব্দ — টিনে।
টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ পৃথিবীর সেরা শব্দগুলোর একটা।
"চা দেব?"
"দিন।" তিতলি বলল।
"আদা দেব?"
"হ্যাঁ।"
তিতলি ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট খাম বের করল।
ছবিটা — স্কেচপেনে আঁকা
মাঠ। শিমুলগাছ। বৃষ্টির পরের আলো।
ঘাসে জলের ঝিকিমিকি। আকাশে একটু রোদ। মেঘ সরছে।
আর গাছের নিচে — দুটো মানুষ। পেছন থেকে দেখা। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
মাথার উপর একটা বিশাল গাছ। সামনে ভেজা মাঠ।
অর্ণব অনেকক্ষণ দেখল। কথা বলল না। তিতলি দেখছে তাকে।
"কেমন হয়েছে?" আস্তে জিজ্ঞেস করল। "তিতলি।"
"হুম।"
"এই ছবিটা—" থামল।
"এই ছবিটায় সেদিনটা আছে। সেদিনের আলো আছে। গাছ আছে। বৃষ্টির পরের গন্ধ আছে।"
"ছবিতে গন্ধ থাকে না — কিন্তু তোমার ছবিতে আছে।"
"কীভাবে?"
"কারণ তুমি অনুভব করে আঁকো। চোখ দিয়ে দেখে নয়।"
তিতলি কিছু বলল না। চায়ের কাপ এল।
বৃষ্টি আরো বাড়ল। টিনের চালে শব্দ আরো বাড়ল।
বাইরে রাস্তায় জল। একটা রিকশা যাচ্ছে। একটা বাচ্চা জলে পা ছপছপ করছে। একটা কুকুর একটা দোকানের সামনে বসে আছে। বৃষ্টি দেখছে। মানুষের মতো।
"দেখো।" তিতলি বলল।
"কী?"
"কুকুরটা।"
"বৃষ্টি দেখছে।"
"হ্যাঁ। কুকুরও বৃষ্টি দেখে। মানুষের মতো।"
"হয়তো কুকুরেরও ভালো লাগে।"
"হয়তো। অথবা হয়তো থামার জায়গা নেই বলে বসে আছে। আমাদের মতো।"
"আমাদের মতো মানে?"
"মানে — আমরাও বৃষ্টিতে আটকে আছি।" "খারাপ লাগছে?" তিতলি একটু ভাবল। "না।"
"কেন?"
"কারণ এখানে চা আছে। তুমি আছ। আর টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ আছে। এটুকু থাকলে আটকে থাকা ভালোই লাগে।"
দ্বিতীয় চা এল। দোকানদার মহিলা বললেন — "থাকো।"
তিতলি দোকানটা দেখল। কাঠের পুরনো তাক। পুরনো ক্যালেন্ডার — দুই বছর আগের। বদলানো হয়নি। একটা কোণে একটা ছোট্ট প্রদীপ জ্বলছে।
"এই প্রদীপটা দেখো।" তিতলি বলল। "দেখছি।"
"বৃষ্টির মধ্যে জ্বলছে।"
"ভেতরে আছে তো। বাইরে নয়।"
"তবু। মনে হচ্ছে — বৃষ্টি যতই হোক, এই আলোটা নিভবে না।"
"ভালো বললে।"
"কী ভালো বললাম?"
"কিছু আলো নেভে না। বৃষ্টিতেও না।"
"তুমি আবার সাধারণ কথাকে অসাধারণ করে দিলে।"
"তুমি বললে।"
"আমি বললাম প্রদীপের কথা। তুমি বানিয়ে দিলে দর্শন।"
অর্ণব হাসল।
"তোমার প্রদীপ থেকে আমার দর্শন।"
"মিলে গেল।"
"সবসময় মেলে।"
বৃষ্টি একটু কমল। কিন্তু দুজন বসে রইল।
"অর্ণব।"
"হুম।"
"একটা কথা বলব?"
"বলো।"
"ভবিষ্যতের কথা।"
অর্ণব তাকাল। তিতলি চায়ের কাপে দুহাত রেখেছে। উষ্ণতার জন্য।
"মানে — আমরা কোথায় যাব?"
"কোথায় যাব মানে?"
"মানে — এই যে আমরা। দুজন। এটা কোথায় যাবে?"
অর্ণব বুঝল। এই প্রশ্নটা আসার কথা ছিল।
"তুমি কী চাও?" তিতলি চুপ করে রইল। বৃষ্টি দেখল।
"আমি চাই এটা থাকুক। এই যে — তোমার সাথে থাকা। রবিবারগুলো। বৃষ্টিতে আটকে পড়া। চায়ের দোকানে বসা। গল্প লেখা। ছবি আঁকা। এই সব।"
"আর?"
তিতলি একটু লজ্জা পেল।
"আর — সারাজীবন।"
সারাজীবন।
এই শব্দটা। এই বৃষ্টিতে। এই টিনের চালের নিচে। এই পুরনো দোকানে। এত সহজে বলল।
তিতলি এখনো চায়ের কাপ ধরে আছে। অন্যদিকে তাকিয়ে। লজ্জা পাচ্ছে।
"তিতলি।"
"হুম।"
"আমিও।"
তিতলি তাকাল। "কী?"
"আমিও সারাজীবন চাই।"
তিতলির চোখে কী একটা হল। শুধু একটু হাসল। সেই হাসি। ঠোঁটের কোণের। প্রথম দিনের।
দোকানদার মহিলা কাছে এলেন। "ভালো লাগছে?" "হ্যাঁ।" তিতলি বলল। "বৃষ্টিতে আটকে পড়া ভালোই।"
"কারণ চলতে চলতে কথা বলার সময় থাকে না। আটকে পড়লে কথা হয়।"
বলে চলে গেলেন। তিতলি তাঁর দিকে তাকাল।
"এই মহিলাও নিতাইদার মতো।" "কীভাবে?" "সঠিক সময়ে সঠিক কথা বলেন।"
"বারাসাতে এরকম মানুষ আছে।"
"সব জায়গায় আছে। শুধু দেখতে হয়।"
বৃষ্টি কমল। কিন্তু দুজন এখনো বসে। কথা হচ্ছে।
"তুমি কি সারাজীবন বারাসাতে থাকতে চাও?" "হ্যাঁ।"
"কেন?"
"কারণ এই শহরটা আমার।" "শুধু এটুকুই কারণ?"
অর্ণব একটু ভাবল। "না। আরো কারণ আছে।"
"কী?"
"কারণ এই শহরে তুমি আছ।"
তিতলি চুপ।
"তুমিও কি থাকবে?"
"থাকতে চাই। কিন্তু—"
"কিন্তু?"
"কিন্তু কাজের কথা ভাবছি। কলকাতায় কাজ করি। বারাসাতে কাজ পাব?"
"পাবে।"
"নিশ্চিত?" অর্ণব সৎভাবে বলল।
"না।"
"কিন্তু মনে হয় — যে মানুষ তার স্বপ্ন নিজে তৈরি করতে পারে, সে নিজের কাজও তৈরি করতে পারে।"
"মানে — তুমি বলেছিলে প্রদর্শনী করতে চাও। নিজের আঁকা দেখাতে চাও।" "সেটা বারাসাতে হবে না কেন?"
"বারাসাতে প্রদর্শনী?"
"কেন নয়?"
"এখানে কেউ আসবে?"
"আসবে। তুমি আঁকলে আসবে।"
তিতলি একটু ভাবল। তারপর হাসল। "তুমি বিশ্বাস করো।" "করি।" "কেন?"
"কারণ তোমার ছবি দেখেছি। সেই মাঠের ছবি। এই ছবিগুলো শুধু দেখার জিনিস নয় — অনুভব করার।"
তিতলির চোখ উজ্জ্বল হল। "তুমি সত্যি বলছ?" "সত্যি।"
"প্রশংসা করছ না?"
"তোমাকে মিথ্যে প্রশংসা করব না। জানো।"
তিতলি মাথা নাড়ল। "জানি।"
"প্রদর্শনীর কথা ভাববে?"
"ভাবছি।"
"কখন করবে?"
"এই বছরের শেষে হয়তো।"
"আমি সাহায্য করব।"
তিতলি তাকাল। "কীভাবে?"
"যেভাবে পারি। লিখে দেব। প্রচার করব। আর—"
"আর?"
"আর প্রথম দর্শক হব।"
"প্রথম দর্শক?"
"হ্যাঁ।"
"প্রথম মানে সবার আগে?"
"সবার আগে।"
তিতলি চুপ করে রইল। তারপর বলল, "ঠিক আছে।"
"কথা?"
"কথা।"
উঠল দুজন। দোকানদার মহিলা বললেন, "আবার এসো।" "আসব।" তিতলি বলল।
"বৃষ্টিতে আটকালে।" অর্ণব বলল।
মহিলা হাসলেন। "বৃষ্টি ছাড়াও আসো।"
বাইরে। রাস্তা ভেজা। বাতাস ঠান্ডা। বর্ষার সন্ধ্যা।
হাঁটছে দুজন। পাশাপাশি।
"আজকে একটা কথা বললাম।"
"কোনটা?"
"সারাজীবনের কথা।"
"হ্যাঁ।"
"মনে আছে তো?"
"আছে।"
"ভুলবে না?"
অর্ণব হাসল। "কবে ভুলি বলো।"

ভেজা রাস্তায় — প্রথম হাত ধরা
হাঁটতে হাঁটতে একটা মুহূর্ত হল। দুজনের হাত পাশাপাশি। একটু দুলছে। তিতলির হাত একটু এগিয়ে এল। অর্ণবের হাতের কাছে।
অর্ণব দেখল। তারপর।
আস্তে।
স্বাভাবিকভাবে।
ধরল। তিতলির হাত।
একটু। তারপর তিতলি আঙুল গলিয়ে দিল।
শক্ত করে নয়। আলতো করে।
যেভাবে কিছু ধরলে ভাঙে না। থাকে।
দুজন হাঁটছে। হাত ধরে।
বারাসাতের বর্ষার সন্ধ্যায়। ভেজা রাস্তায়।
কথা নেই। কিন্তু এই হাত ধরাতে একটা কথা আছে।
যেটা বলার নয়। শুধু অনুভবের।
কদমতলার মোড়ে। আজ বিদায়।
হাত ছাড়ল। কিন্তু তাড়াহুড়ো নেই। ধীরে।
"পরেরবারও আটকাব।"
"ছাতা নিও না তাহলে।"
"ছাতা থাকলেও আটকাব।"
"কেন?"
"কারণ সেই দোকানে চা ভালো ছিল।"
অর্ণব হাসল। "শুধু চায়ের জন্য?"
তিতলি একটু হাসল। ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। কিছু বলল না। কিন্তু অর্ণব জানে — শুধু চায়ের জন্য নয়।
রাতে। মোবাইলে মেসেজ।
"বাড়ি পৌঁছেছি।"
"ভালো।"
"তুমি?"
"আমিও।"
"অর্ণব।"
"হুম।"
"আজকে হাত ধরেছিলে।"
"তুমি এগিয়ে দিয়েছিলে।" "দিয়েছিলাম।"
"কেন?"
"কারণ ইচ্ছে হয়েছিল।"
"আমারও।"
"তাহলে মিলে গেল।"
"সবসময় মেলে।"
"সারাজীবনের কথাটা মনে আছে?"
"আছে।"
"ভুলবে না বলেছিলে।"
"ভুলব না।"
"প্রতিশ্রুতি?"
"প্রতিশ্রুতি।"
তিতলি আর কিছু লিখল না। শুধু একটা ছোট্ট হৃদয়। ❤

বর্ষার রাত — তারা বেরোচ্ছে মেঘের ফাঁকে
ছাদে গেল। বারাসাতের রাত। বৃষ্টির পরের রাত।
মেঘ সরছে। তারা বেরোচ্ছে। একটা একটা করে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। ফুলের গন্ধ। বর্ষার গন্ধ।
হাতটা দেখল। তিতলির হাত ধরেছিল। সেই উষ্ণতা এখনো আছে। মনে।
আজকে একটা কথা হল।
সারাজীবন।
সারাজীবন মানে — সব ঋতু।
গ্রীষ্মের রোদ। বর্ষার বৃষ্টি। শরতের কাশফুল। হেমন্তের শিশির। শীতের কুয়াশা। বসন্তের পলাশ।
সব।
আর তিতলি সাথে। প্রতিটা ঋতুতে।
পাশের বাড়ির কাকু। রেডিও বাজাচ্ছেন। বৃষ্টির পরে। রবীন্দ্রনাথ।
"...আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ-ধুলার তলে..."
অর্ণব শুনল। চোখ বন্ধ করল। এই গানটা। এই রাতটা। এই বাতাসটা। এই মুহূর্তটা। লিখবে। একদিন। তৃতীয় গল্পে।
ভেতরে ঢুকল। ডায়েরি খুলল।
ডায়েরি
"আজকে বৃষ্টিতে আটকেছিলাম।
একটা পুরনো চায়ের দোকানে।
টিনের চালে শব্দ।
একটা প্রদীপ জ্বলছিল।
তিতলি বলল — সারাজীবন।
আমিও বললাম — সারাজীবন।
তারপর হাত ধরলাম।
বৃষ্টির মধ্যে।
আলতো করে।
যেন ভাঙবে না।
থাকবে।"
কলম রাখল। পড়ল। এই লাইনগুলো।
কবিতা নয়। গল্প নয়।
শুধু সত্যি।
✦ দ্বাদশ পর্বের সমাপ্তি ✦
পরের পর্বে
শরৎ এল। আকাশ পরিষ্কার হল। কাশফুল ফুটল। তিতলির প্রদর্শনীর প্রস্তুতি শুরু হল। অর্ণব সাহায্য করছে। দুজন মিলে কাজ করছে। আর এই কাজের মধ্যে একটা উপলব্ধি হল — দুটো মানুষ যখন একসাথে স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নটা আর শুধু একজনের থাকে না। হয়ে যায় দুজনের।
অপেক্ষায় থাকুন — ত্রয়োদশ পর্ব: "দুজনের স্বপ্ন"
ভবিষ্যতের ঠিকানা লেখা হয় বর্তমানে। আজকে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে — একটা পুরনো দোকানে — দুটো মানুষ ভবিষ্যৎ লিখল। বড় কথায় নয়। সারাজীবন মানে বিশাল প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বলা হল সহজে। স্বাভাবিকভাবে। যেভাবে বৃষ্টি আসে। যেভাবে তারা ওঠে। যেভাবে ভালোবাসা আসে। তাড়াহুড়ো নেই। শুধু আছে — সত্যি।

